Monday, April 6, 2015

পুরোনো diary র পাতা থেকে -৩১/১২/২০১১

ফেলে আসা পথ

কুয়াশার মধ্যে দিয়ে পথ হাঁটা। আমার দৃষ্টি অস্বচ্ছ, সামনে জমাট কুয়াশা, শুধু খুব কাছাকাছি মানুষগুলোকে দেখা যায়। তাদের হাত ধরে গতি কখনও দ্রুত, কখনও বা মন্থর হয়ে আসে যখন একাকিত্ব বাসা বাঁধে ভিতরে ভিতরে। সেদিন সামনে শুধু একফালি রোদ, ঐ রোদ্টুকুই ভাসিয়ে দিয়েছে একটা চোরাস্রতা নদীর একূল ওকূল। ঝিরঝিরে কযেকটা  ধারা বয়ে যাচ্ছে শুধু পায়ের পাতাটুকু ভেজার মতো, আর একঝাঁক হলুদ প্রজাপতি নদীর ধারে, ওদের বড় হয়ে ওঠার mud puddling , ওদের খেলে বেড়ানো, ওরা সেদিন বড় হওয়ার হাতছানি দিয়েছিল।  mobile র tower পাওয়া যায় না জয়ন্তী র ধারে, তাই তিনদিন কথা হয়নি। এই তিনদিনেই কত কথা জমে গেছে বুকের ভিতর।হারিয়ে গেছি নিজেই, আসলে সব কিছু জমিয়ে রাখছি ভিতরে ভিতরে, পরে গিয়ে মস্ত এক ছবি আঁকবো ওর সামনে। পোখরীতে ট্রেকিং  করে প্রায় ঘন্টাখানেকের ও বেশী টানা খাঁড়াই পথ  বেয়ে উপরে উঠে হাতির টাটকা পায়ের ছাপ, ওদের বন ভেঙ্গে তৈরী করা পথ, ধনেশ গুলোর ওড়া cretaceous যুগের ডাইনোসর পাখির মতো, অজানা ফুল, বনের গন্ধ, লাল পিপড়ের ঝুলন্ত বাসা, দূরের নদীপাড়ের সূর্যাস্ত পাহাড়ের কোলে মাথা রেখে, সব ঝুলিতে পুড়েছি। তিনদিন বাদে ওর গলা শুনলাম স্টেশনে। Excursion সেরে ফিরছি, উত্তরবঙ্গ মিস, অগত্যা আর একটু এগিয়ে এসে কাঞ্চনকন্যার জেনারেল কামরা, সারা রাত বসে। তবু বিকেলবেলায় ওর গলার স্বরটা পেয়ে আবার বুক ভরে শ্বাস নিলাম। "মেয়েটা কোথায় বনে বনে ঘুরে বেড়াচ্ছে, আমার চিন্তায় ঘুম হচ্ছে না, এই আমাকে বাঘ দেখাবি না ? নিয়ে জাবি না আমায়?" তারপর সন্ধেবেলায় একধ্বাক্কায় অনেক দূর, আমার শ্রদ্ধার সম্পর্কটা নিয়ে ভুল বোঝাবুঝি, এক পৃথিবী ভুল। বারবার প্রশ্ন "তোর্ পাশে কে বসে আছে, কার আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি ?" "আমি জেনারেল কামরায় ফিরছি, এত লোকজন এইটুকু কামরা আওয়াজ হবে না?"
                         সেই শুরু তারপর আরও সরতে সরতে একপৃথিবী দূরে সরে যাওয়া, সব শুকিয়ে যাওয়া, আমার সাধের ঘর তৈরী হওয়ার আগেই ভেঙ্গে পড়লো। মুঠো ভর্তি বালির মত যতই আঁকড়ে ধরতে চাই ততই ফাঁক ফোকর গলে ঝুরঝুর করে ঝরে পড়ে।  শুধু গন্ধগুলো, স্পর্শগুলো  আর মুহূর্তগুলো জেগে থাকে, বেঁচে থাকে স্মৃতিতে।
                                               "তুমিতো সেই যাবেই চলে, আমায় ব্যাথা দিয়ে গেলে..........
                                           .......বেলা যাবে, আঁধার হবে, একা বসে হৃদয় ভরে 
                                                        আমার বেদন খানি আমি রেখে দেব মধুর করে
                                                    বিদায় বাঁশির করুণ রবে, সাঁঝের গগন মগন হবে 
                                               চোখের জলে দুখের শোভা, নবীন করে দেবো রাখি.............
                                        তো সেই যাবেই চলে..............."
প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে সম্পর্ক ভাঙ্গার ইতিহাস বয়ে চলেছে, এ গল্প কারুর কাছে নতুন নয় তবুও কিছু ভাঙ্গার স্মৃতিও স্বর্গীয় সুখ দেয়, এক বিন্দু অমৃত হয়ে হৃদয় পাত্রে চিরকাল রয়ে যায়- এ সুখ ছড়িয়ে দিলে বাড়ে বইকি কমে না। তবুও বেদনা যখন গভীর হয় তখন সে একান্ত আপন, সম্পূর্ণ নিজের। তখন ফেব্রুয়ারী মাস জানলার ঝাপসা কাঁচ দিয়ে দেখি শিশির পড়ছে ভোরবেলা, নারকেল গাছের পাতাগুলো দিয়ে বিন্দু বিন্দু করে সে জল ঝরছে। এ দিকে আমার চোখ দিয়ে উষ্ণ শিশির স্রোত সমানে গড়িয়ে পড়ছে- একদিন, দুদিন, দিনের পর দিন। ও বললো ও ভেসে যাচ্ছে, আটকাতে পারছে না নিজেকে, আর আমিও পারলাম না একগোছা কাছি ফেলতে, দূরত্বটা যে সাত সমুদ্র তেরো নদীর। শেষ স্বাক্ষী এয়ারপোর্ট র রেলিং এপারে আমি র ওপারে ছলছল করছে দুটো চোখ। ছেড়ে যাওয়ার দুঃখ যদিও তারা তখনও জানে না। এবারের ছেড়ে যাওয়া জীবনের মতো, আর বাড়ি ফিরে এসে একছুটে ছাতে গিয়ে দেখি সেই উড়োজাহাজটা মেঘের মধ্যে মিলিয়ে গেল দূরে যেতে যেতে। ঠিক ছিল শুধু পরীক্ষাটুকু দিয়ে চলে আসবে আমেরিকাকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে, কথাগুলো পাক খেয়ে আজও বাতাসে ঘুরপাক খায়। তবুও ভেঙ্গে পড়ার মুহূর্তগুলোর মধ্যে দিয়ে চলতে হয়। ঠিক করলাম প্রতিদিন ঘুম ভেঙ্গেই যখন একটা একটা করে মৃত্যু জন্মাবার প্রসব যন্ত্রণা ভোগ করি তখন এই সময়টাতেই সাঁতার শিখে আসি, ভাসিয়ে দিই ভারাক্রান্ত দেহটাকে, বেঁচে থাকতে গেলে লড়াই করে বাঁচতে হয়। ফেরার পথে যখন সূর্যটার টাটকা কাঁচা রোদটা আমার সিক্ত শরীরটাকে উষ্ণ করে, তখন আবার করে বেঁচে ওঠার তাগিদ জন্মায়, মনে হয় নাটকের শেষ অঙ্কের স্বাক্ষী না থাকলে জীবন অপূর্ণ। 
                      অনির্বাণ, আমার ভালো বন্ধু, আমরা বহুদিন কলেজের স্টাফ রুমে বসে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তর্ক বিতর্ক জুড়েছি। ও ইতিহাসের ছাত্র তবে ওর গন্ডিটা অনেক বিস্তৃত, আর সেটা ওর ভিতর ঘরের চৌকাঠ না পেরোলে বোঝা যায় না। আমাদের বন্ধুত্বটা নিখাদ বন্ধুত্ব বৈকি আর কিছু ছিল না। মিশতে মিশতে বুঝেছিলাম একটা ভরসার জায়গা আছে, যেখানে ভিতরকার পাথরটাকে ক্ষণিকের জন্য নামিয়ে রাখা যায়, আর এক ঝলক ঠান্ডা বাতাস আমার ভিতর ঘরে প্রবেশ করে, আমি বুক ভরে শ্বাস নিই। রাতের ঘরের আলোটা নিভে যাওয়ার পর যখন মৃত্যু চেতনা গুলো জেগে ওঠে, আর নিঃশ্বব্দ কান্নার প্রয়োজন হয় পাছে পাশে শুয়ে মা জেনে যান, তখন একমাত্র ওই পারে আমার চেতনাগুলোর মাথায় হাত দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিতে-
         "মৃত্যু ডাকলে আসে না নবনীতা, খেলার মাঝে আসে, কোনো এক সাদা রাতে বা কালো দিনে তোকে বা আমাকে নিয়ে চলে যেতে পারে। আপন মনে ততোক্ষণ আমরা খেলা করি, নিজে থেকে ছুটি নিস্ না। 'সেদিন যেন তোমার ডাকে ঘরের বাঁধন আর না থাকে'। তারপর এক এক রাত্রি যায়, আর আমি উপলব্ধি করি ওর শব্দগুলো জাগতিক সমুদ্র ছাড়িয়ে ছায়াপথে খেলা করছে, যুগযুগান্তরের পথচিহ্ন হয়ে পড়ে আছে। ঘর বাঁধার স্বপ্ন নেই, শরীরের খোলসটা কখন শীতের খসে যাওয়া পাতার মতো ঝরে গেছে, তবুও অনন্ত যাত্রা। আমি মাঝে মাঝে অবাক হয়ে যাই বাসনা, আকাঙ্ক্ষা, কাম এসব পার্থিব স্বপ্ন ছাড়াই রাতের পর রাত এতগুলো শব্দমালা তৈরী হলো কেমন করে? আজ ৩১সে ডিসেম্বর ২০১১ আজ ভোরে উঠে দেখলাম আমার গত একবছরের স্মৃতি। কুয়াশার চাদরে ঢেকে রাখা খড়কুটো আমার ঝলমলে সোনার ফসল।
                                                  পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখি ফেলে আসা পথ 
                                              যে পথ আমি নরম করতে চেয়েছিলাম নোনাজলে 
                                                         অজস্র মুক্তদানা ছড়িয়ে আছে।।।।।।।।